পাশ্চাত্য অপসংস্কৃতির প্রভাবে এখন বাংলাদেশের প্রবীণরাও আপন সন্তানদের হাতেই নির্যাতিত হচ্ছে। শেষ বয়সে তাদের ঠাঁই হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে।
সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার বিমুখতা, সন্তানদের সম্মানিত ইসলামী অনুভূতি ও মূল্যবোধের চর্চা না করানোই এর মুখ্য কারণ।
সম্মানিত ইসলামী শরীয়তের অনুশীলনই পারে এই গযব থেকে জনগণকে পানাহ দিতে এবং পিতা-মাতার সাথে সন্তানের মুহব্বতকে নিগুঢ় করতে।
এডমিন, ৭ই জুমাদাল ঊলা শরীফ, ১৪৪৪ হিজরী সন, ০৩ সাবি’, ১৩৯০ শামসী সন, ০২রা ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রি:, ১৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ ফসলী সন, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) মন্তব্য কলাম
* ভাত খেতে চাওয়ায় ছেলের হাতে রক্তাক্ত বৃদ্ধ মা
* সম্পত্তির লোভে মাকে মেরে ডাস্টবিনে ফেলে দিলো ছেলে
* খাবার চাওয়াই মারধোর করে মাকে বাড়ি থেকে বের করে দিলো ছেলে
* মাকে মিষ্টি খাওয়ানোয় বৃদ্ধ বাবাকে অসহনীয় প্রহার ছেলের
* ভিক্ষা করে মানুষ করা সন্তানেরা বৃদ্ধা মাকে ফেলে দিয়েছেন
* মা-বাবাকে জুতাপেটা : দুই ছেলের ঠাঁই হলো কারাগারে
* বৃদ্ধা মাকে রাস্তায় ফেলে গেল সন্তান
* জন্মদাত্রীর শেষ ঠিকানা যখন বৃদ্ধাশ্রম
অন্যদিকে, দেশে প্রতিনিয়ত বেড়ে যাচ্ছে প্রবীণদের সংখ্যা। যার অধিকাংশই আপন সন্তান এবং পরিবারের সদস্যদের হাতেই নানামুখী নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, দেশের অর্ধেকেরও বেশি প্রবীণ পরিবারের সদস্যদের হাতে শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এসব প্রবীণরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজ সন্তান, পুত্রবধূ, জামাতা, নাতি-নাতনী এমনকি জীবনসঙ্গীর কাছ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে বলে ওই গবেষণায় দেখানো হয়েছে। দেশের ৮৮ দশমিক ৪ ভাগ প্রবীণ মানসিক নির্যাতন, ৮৩ দশমিক ৩ ভাগ অবহেলা ও ৫৪ দশমিক ৪ ভাগ অর্থনৈতিক প্রবঞ্চনার শিকার হচ্ছে। তবে পুরুষের তুলনায় নারীরা পারিবারিক নির্যাতনের শিকার অপদস্থ হচ্ছে বেশি। নির্যাতনের পাশাপাশি পিতা-মাতা বৃদ্ধ হলেই বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসার যে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি রয়েছে তা বাংলাদেশের কথিত আধুনিক জনগন পালন করছে। গত কয়েক বছরে দেশে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছে অনেকগুন।
উল্লেখ্য, একসময় সন্তান কর্তৃক পিতা-মাতাকে নির্যাতন ইউরোপ-আমেরিকা তথা পশ্চিমা বিশে^র নীতি ও মূল্যবোধ বিবর্জিত বল্গাহারা জনগনের মধ্যেই শোনা যেত। কারণ পশ্চিমা বিশ^ বরাবরের মতোই ছিলো বর্বর ও হিতাহিত জ্ঞান হারানো। কিন্তু ইদানিং তাদের সেই অপসংস্কৃতি ও অমানবিক আচরণগুলো এখন বাংলাদেশের মতো মুসলিম অধ্যুষিত দেশেও প্রভাব ফেলছে। আর এর মূল কারণই হচ্ছে দেশের জনগন দ্বীনি মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে গিয়েছে। কারণ প্রচলিত মেরুদ-বিহীন শিক্ষা শুধু মানুষকে বাইরে তথাকথিত শিক্ষিত করে তুলতে পারে, ভেতরে এর কোনো প্রভাব পড়েনা। কিন্তু সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার অনভূতি ও মূল্যবোধ জাহিরীর পাশাপাশি বাতেনিভাবেও মানুষকে একজন সত্যিকারভাবে এগিয়ে নিয়ে যায়। আধুনিক শিক্ষা মানুষকে তথ্যবান করলেও বিবেকবান করতে পুরোটাই ব্যর্থ। তথাকথিত আধুনিক শিক্ষিত সমাজের অধিকাংশ লোক মা-বাবার প্রয়োজনীয়তা সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। জীবনের পড়ন্তবেলায় আপন সন্তানের চরম অবহেলা অনাদরে নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে মৃতুবরণ করছে, এমন মা-বাবার সংখ্যা এ দেশে নেহায়েত কম নয়। প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে সন্তানের কাছে বৃদ্ধ মা-বাবা বোঝা স্বরূপ হয়ে যায়।
তবে এ কথাও ঠিক যে, আজকে প্রবীণদের যে দুঃখ দুর্দশা তথা প্রবীণদের প্রতি সন্তানের মায়া-মমতাহীনতার কথা বলা হচ্ছে এর জন্য এক অর্থে প্রবীণরাই দায়ী। কারণ আজকের প্রবীণরা তাদের সন্তানদের পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত করেছে। সেই শিক্ষার রেশ ধরেই পাশ্চাত্য কালচার বৃদ্ধাশ্রমের প্রচলন হয়েছে। অথচ প্রবীণরা যদি সন্তানদের শুধু বস্তুবাদী শিক্ষায় শিক্ষিত না করে পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের আলোকে বা শিক্ষায় শিক্ষিত করতো তাহলে তাদের মধ্যে সম্মানিত ইসলামী চেতনা কাজ করতো এবং তারা পিতা-মাতার হক্ব আদায় সম্পর্কে সচেতন ও সক্রিয় থাকতো।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বর্তমানে কিছু মহল রয়েছে যারা প্রবীণ নির্যাতন তথা আপনজনের হাতে প্রবীণদের নির্যাতনের বিষয়টি দেশের প্রচলিত আইনের মাধ্যমে সুরাহা করতে চায়। কিন্তু আইন দিয়ে কোনোসময়ই পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের মুহব্বত ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কারণ পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা এবং সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার মুহব্বত একটি মহাসম্মানিত কুদরতী বিষয়। এটি মহান আল্লাহ পাক উনার তরফ থেকে একটি নিয়ামত। তাই মানুষের তৈরী তুচ্ছ আইন দিয়ে এই বিষয়টি কোনোভাবেই সমাধান করা সম্ভব নয়। এই বিষয়টি সমাধানে একমাত্র মাধ্যম হতে পারে সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার আদর্শ ও অনুভূতি চর্চা। মহান আল্লাহ পাক তিনি নিজেও পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে মাতা-পিতা উনাদের দায়িত্ব সম্পর্কে বলেছেন- ‘আর তোমাদের প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা উনাকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত-আনুগত্য করো না এবং পিতা-মাতা উনাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করো; যদি উনাদের একজন বা উভয়ই তোমাদের সামনে বার্ধক্যে উপনীত হন তবে তুমি উনাদের প্রতি উহঃ (ঘৃণা বা দুঃখ ব্যঞ্জক) শব্দটিও বলো না এবং উনাদেরকে ধমক দিও না এবং বলো উনাদেরকে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা। এবং উনাদের সামনে মুহব্বতের সাথে নম্রভাবে বাহু নত করে দাও এবং (মহান আল্লাহ পাক উনাকে) বলো- আয় মহান আল্লাহ পাক! উনারা (অর্থাৎ পিতা-মাতা) শৈশবে আমাকে যেভাবে স্নেহ-যতেœ লালন-পালন করেছেন, আপনিও উনাদের প্রতি সেভাবে সদয় হউন।’ (পবিত্র সূরা বনী ইসরাঈল শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ২৩-২৪)
পিতা-মাতা উনাদের মর্যাদা বলতে গিয়ে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন, ‘মা উনার পদতলে সন্তানের বেহেশত।”
তিনি আরো ইরশাদ মুবারক করেন, ‘পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি, পিতা-মাতার অসন্তুষ্টিতে মহান আল্লাহ পাক উনার অসন্তুষ্টি।’ কাজেই জান্নাতে যেতে হলে অবশ্যই উনাদের সেবা করতে হবে এবং উনাদের অনুগত থাকতে হবে। উনাদের হক্ব আদায় করতে হবে। এবং এজন্য সচেতন ও সক্রিয় থাকতে হবে। উনাদেরকে কখনই বৃদ্ধাশ্রমে ঠেলে দেয়া যাবেনা বা ফেলে রাখা চলবেনা।
পরিশেষে, আজকে প্রবীণদের যে দুরবস্থা তার মূলেই রয়েছে সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার বিমুখতা। যদি সরকারিভাবে দেশের প্রত্যেকটি ঘরে ঘরে সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার আদর্শ অনভূতি মূল্যবোধ পৌছে দেয়া যায় তাহলে চিরতরে বন্ধ হবে সন্তান কর্তৃক পিতা-মাতা নির্যাতন। কারণ একমাত্র দ্বীন ইসলাম উনার অনুভূতিই পারে সন্তান ও পিতামাতার মধ্যকার সম্পর্ককে সমুন্নত করতে।
-আল্লামা মুহম্মদ ওয়ালীউর রহমান।













